• May 24, 2021

হাসারাঙ্গার ঝড় থামিয়ে বাংলাদেশের জয়

ব্যাটে-বলে পরিপাটি পারফরম্যান্সে বড় জয়ের আয়োজন হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের সেই সাজানো বাগান অনেকটা এলেমেলো করে দিলেন ভানিন্দু হাসারাঙ্গা। তবে তরুণ শ্রীলঙ্কানের বীরোচিত পারফরম্যান্স শেষ পর্যন্ত পূর্ণতার রূপ পেল না। তাকে থামিয়েই জয়ের ফুল ফোটাল বাংলাদেশ। ।

শ্রীলঙ্কাকে ৩৩ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের অভিযান শুরু করল বাংলাদেশ। তিন সংস্করণ মিলিয়ে ১০ ম্যাচ পর ধরা দিল কাঙ্ক্ষিত জয়।

মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে রোববার মুশফিকুর রহিমের দুর্দান্ত ইনিংসের সঙ্গে তামিম ইকবাল ও মাহমুদউল্লাহর ফিফটিতে বাংলাদেশ ৫০ ওভারে তোলে ২৫৭ রান। শ্রীলঙ্কা অলআউট হয় ২২৪ রানে।

মন্থর উইকেটে মেহেদী হাসান মিরাজের দুর্দান্ত বোলিংয়ে একসময় অনায়াস জয়ের পথে এগোচ্ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু আট নম্বরে নেমে হাসারাঙ্গার ভয়ডরহীন ব্যাটিং জমিয়ে দেয় ম্যাচ। ৭ ওভার যখন বাকি, তখনও জিইয়ে শ্রীলঙ্কার আশা আর বাংলাদেশের শঙ্কা। কিন্তু ৫ ছক্কায় ৬০ বলে ৭৪ রান করে হাসারাঙ্গা আউট হওয়ার পর আর পেরে ওঠেনি লঙ্কানরা।

হাসারাঙ্গাকে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে স্বস্তি এনে দেন মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন। তবে বাংলাদেশের বোলিংয়ে নায়ক মিরাজ। পাওয়ার প্লেতে অসাধারণ বোলিংয়ের ধারাবাহিকতা পরেও ধরে রেখে এই অফ স্পিনারের শিকার ৩০ রানে ৪ উইকেট। এর মধ্যে হাসারাঙ্গাই ৬ বলে নেন ১৫ রান। তার বাকি ৫৪ বলে আসে কেবল ১৫ রান!

ম্যাচের নায়ক অবশ্য আরেকজন, বাংলাদেশের ইনিংসের প্রাণ যার ইনিংস। যে উইকেটে দ্রুত রান করতে ভোগান্তিতে পড়েন সতীর্থরা, সেখানেই মুশফিক খেলেন ৮৭ বলে ৮৪ রানের ইনিংস। তার ইনিংসে চার কেবল ৪টি, ছক্কা ১টি। শট খেলা সহজ নয়, এমন উইকেটেও দারুণ ব্যাটসম্যানশিপের প্রদর্শনী মেলে ধরে বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান করতে সমস্যা হয়নি তার।

অধিনায়ক তামিম ইকবাল করেন ৭০ বলে ৫২, মাহমুদউল্লাহ ৭৬ বলে ৫৪। দুজনের ইনিংসকে রাখা যায় পাশাপাশিই, শেষটায় দুজনকেই দাঁড় করানো যায় কাঠগড়ায়।

তামিম ইকবাল

শুরুর প্রতিবন্ধকতায় দলের ইনিংস দারুণ ব্যাটিংয়ে টেনে নেন তামিম। যখন তার কাছে চাওয়া বড় ইনিংস, তখনই বাংলাদেশ অধিনায়ক বিদায় নেন নিজের ভুলে। মুশফিকের সঙ্গে জুটিতে মাহমুদউল্লাহ খেলছিলেন দারুণ। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন শেষ ১০ ওভারের দাবি মেটাতে।

প্রচণ্ড গরমে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নামে টস জিতে। ইনিংসের শুরুর পাঁচ ওভারের উইকেটে বাউন্স ছিল বেশ ভালো। দ্রুত রান করার সুযোগ ছিল তখন। কিন্তু ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারে দুশমন্থ চামিরার বল জায়গায় দাঁড়িয়ে খেলে লিটন দাস ধরা পড়েন স্লিপে। পাঁচ ইনিংসের মধ্যে এই নিয়ে তৃতীয়বার শূন্য রানে আউট হলেন এই ওপেনার।

সাকিব আল হাসান উইকেটে যাওয়ার পরপরই দুটি বাউন্ডারি আদায় করেন। কিন্তু এরপর তার ব্যাট থেকে হারিয়ে যায় টাইমিং। তামিমের ব্যাটেই তখন রান যা একটু বেড়েছে।

সাকিবের অস্বস্তির পথচলা শেষ হয় দানুশকা গুনাথিলাকার বলে, ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে খেলে ক্যাচ দেন তিনি লং অনে (৩৪ বলে ১৫)।

মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ জুটি

৬৪ বলে ৩৮ রানের এই জুটিতে দলের ইনিংস ছিল দিশাহীন। পরের জুটিতে তামিম ও মুশফিক এনে দেন গতি। বল প্রতি রান করতে থাকেন মুশফিক। তামিমও সময়ের সঙ্গে স্বচ্ছন্দ হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ অধিনায়কের ৫১তম ওয়ানডে ফিফটি আসে ৬৬ বলে।

ফিফটির পরপর ধনাঞ্জয়া ডি সিলভাকে অযথা শাফল করতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে বসেন তামিম। এলবিডব্লিউ হয়ে যান অফ স্পিনারের ইয়র্কারে। পরের বলেই আবার ধাক্কা। প্রথম বলেই দৃষ্টিকটুভাবে প্যাডল করার চেষ্টায় এলবিডব্লিউ মোহাম্মদ মিঠুন। গুছিয়ে ওঠার পথে থাকা দলের ইনিংস দুই বলেই আবার অগোছালো।

মুশফিক-মাহমুদউল্লাহর জুটি সেখান থেকে উদ্ধার করে দলকে। সবশেষ নিউ জিল্যান্ড সিরিজে তিন ওয়ানডেতেই থিতু হয়ে আউট হওয়া মুশফিক এবার ফিফটি করে ফেলেন ৫২ বলেই।

দুজনের জুটির শতরান আসে ১১৫ বলে।

মুশফিকের সামনে যখন সেঞ্চুরির হাতছানি, ক্যারিয়ারে আগের অনেকবারের মতো আবার তার পতন ডেকে আনে সুইপ শট। লাকশান সান্দাক্যানকে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে ধরা পড়েন শর্ট থার্ড ম্যানে।

মাহমুদউল্লাহর রান এক পর্যায়ে ছিল ৪৬ বলে ৪০। এরপরই বিস্ময়করভাবে থমকে যায় তার রানের চাকা। ফিফটি করতে লাগে ৬৯ বল! পরে পারেননি সেটা পুষিয়ে দিতে।

শেষ দিকে আফিফ হোসেনের ২২ বলে ২৭ ও মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনের ৯ বলে ১৩ রানের ইনিংসে কিছুটা বাড়ে দলের রান।

শ্রীলঙ্কার সেরা বোলার ধনাঞ্জয়া, যিনি দলের মূল বোলারদের কেউ নন। পাওয়ার প্লের ভেতরে এবং শেষ দিকেও দারুণ বোলিংয়ে তিনি নেন ৩ উইকেট।

বোলিংয়ের শুরুটা বাংলাদেশের দুই প্রান্ত থেকে হয় দুইরকম। এক পাশে দারুণ নিয়ন্ত্রিত শুরু করেন মিরাজ, আরেক পাশে তাসকিন আহমেদের প্রথম দুই ওভারেই গুনাথিলাকা মারেন পাঁচটি বাউন্ডারি।

বিপজ্জনক হয়ে উঠতে থাকা গুনাথিলাকাকে থামান মিরাজ। মুস্তাফিজুর রহমান বোলিংয়ে এসেই ফিরিয়ে দেন পাথুম নিসানকাকে।

দুই কুসল, অধিনায়ক পেরেরা ও সহ-অধিনায়ক মেন্ডিস চেষ্টা করেন তৃতীয় উইকেটে জুটি গড়ার। সেই চেষ্টায় বাধ সাধেন সাকিব। মেন্ডিসকে ফিরিয়ে পূর্ণ করেন স্বীকৃত ক্রিকেটে তার হাজার উইকেট।

মিরাজ দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে ভেঙে দেন লঙ্কান ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড। অধিনায়ক পেরেরা বোল্ড হন ৫০ বলে ৩০ করে। ধনাঞ্জয়া ও আশেন বান্দারা বোল্ড হন তেঁড়েফুঁড়ে শট খেলার চেষ্টায়। ২৮তম ওভারে ১০২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে লঙ্কান ইনিংস তখন বিধ্বস্ত।

মিরাজের ৪ উইকেট

সেই ধ্বংসস্তুপ দাঁড়িয়েই হাসারাঙ্গার সৌধ গড়ার চেষ্টা। শুরুতে দাসুন শানাকার সঙ্গে ৪৭ রানের জুটিতে গড়েন প্রতিরোধ। পরে ইসুরু উদানার সঙ্গে জুটিতে শ্রীলঙ্কাকে দেখান জয়ের স্বপ্ন।

৩১ বলেই হাসারাঙ্গা স্পর্শ করেন ফিফটি। তার পাল্টা আক্রমণে হতচকিত বাংলাদেশ খুঁজতে থাকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ। ৬৩ রানে সাকিবের বলে তার ক্যাচ ছাড়েন লিটন।

তবে শেষ পর্যন্ত দুঃসহ গরমে ক্লান্তি পেয়ে বসে তাকে। সাইফ উদ্দিনকে পুল করে জোর পাননি শটে, ধরা পড়েন আফিফ হোসেনের হাতে।

এরপর দ্রুত শেষ দুই উইকেট নিয়ে নেন মুস্তাফিজ। জয়ের হাসিতে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।

সংক্ষিপ্ত স্কোর :

বাংলাদেশ : ৫০ ওভারে ২৫৭/৬ (তামিম ৫২, লিটন ০, সাকিব ১৫, মুশফিক ৮৪, মিঠুন ০, মাহমুদউল্লাহ ৫৪, আফিফ ২৭*, সাইফ ১৩*; উদানা ১০-১-৬৪-০, চামিরা ৮-০-৩৯-১, ধনাঞ্জয়া ১০-০-৪৫-৩, গুনাথিলাকা ২-০-৫-১, হাসারাঙ্গা ১০-০-৪৮-০, সান্দাক্যান ১০-০-৫৫-১)।

শ্রীলঙ্কা : ৪৮.১ ওভারে ২২৪ (গুনাথিলাকা ২১, কুসল পেরেরা ৩০, নিসানকা ৮, কুসল মেন্ডিস ২৪, ধনাঞ্জয়া ৯, বান্দারা ৩, শানাকা ১৪, হাসারাঙ্গা ৭৪, উদানা ২১, সান্দাক্যান ৮*, চামিরা ৫; মিরাজ ১০-২-৩০-৪, তাসকিন ৯-০-৬২-০, মুস্তাফিজ ৯-০-৩৪-৩, সাইফ ১০-০-৪৯-২, সাকিব ১০-০-৪৪-১, মাহমুদউল্লাহ ০.১-০-১-০)।

ফল : বাংলাদেশ ৩৩ রানে জয়ী

সিরিজ : ৩ ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে।

ম্যান অব দা ম্যাচ : মুশফিকুর রহিম।

One thought on “হাসারাঙ্গার ঝড় থামিয়ে বাংলাদেশের জয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *